বান্দরবান—পাহাড়ের টান

Mohammad Tauheed in Bandarban

পাহাড় আমাকে তেমন টানে না। আমার প্রিয় গন্তব্য হচ্ছে পানি। খাল, বিল, হাওড়, নদী, সাগর, দ্বীপ—নৌকা, জাহাজ, বইঠা, সাঁতার—সুযোগ পেলেই ঝাঁপ দিতে মন চায় আমার। তবে কালে ভদ্রে পাহাড়ে চড়া হয়েছে বৈ কি!

প্রথম উল্লেখযোগ্য পাহাড় বাউয়ার অভিজ্ঞতা কানাডায়। ব্লু মাউন্টেনে চড়েছিলাম মাইনাস আঠারো ডিগ্রি তাপমাত্রায়। স্নো-শু পরে বরফে ঢাকা পাহাড় ধরে পাঁচ কিলোমিটার উত্তরণ। মাঝে পথ হারিয়ে আতঙ্কে দিশেহারা হয়েছিলাম, তারপর আমাদের সাথের কুকুরটা ফেরত এসে আমাকে পথ দেখিয়ে বাকি পথ নিয়ে গেল। চূড়ায় পৌঁছে মূর্ছা গেলাম। প্রায় আধা ঘন্টা পর জ্ঞান ফিরলে গরম দুধ আর কফি খেয়ে বাঁচলাম সে যাত্রা। এরপর শুনি নিচ থেকে ব্লু মাউন্টেনের চূড়ায় পোঁছানোর জন্য ক্যাবল কার ছিল! আমি চেতেমেতে বললাম, তাহলে আমরা কোন দুঃখে এত কষ্ট করে স্নো-শু পরে পাঁচ কিলো হেঁটে উঠলাম?

এর উত্তর আসলে পাহাড় চূড়ায়, বা গন্তব্যে নাই, আছে পথে। পাহাড়ের পথে বাঁকে বাঁকে যে সব দৃশ্য চোখে পড়ে, প্রকৃতির নিষ্ঠুর অহংকারী সৌন্দর্য—তা শত ছবি, ভিডিও দিয়েও ব্যাখ্যা করা সম্ভব না। তার জন্য আপনাকে পাহাড় বাইতেই হবে। পাহাড়ে চড়ার আরেকটি প্রাপ্তি হচ্ছে, নিজের শরীরকে চেনা। পদে পদে আপনার মনে হবে এই বুঝি শেষ, এই সামনের টিলাটা চড়লেই সামিট, এই বুঝি আমি শেষ, আর তো পা চলে না। গরম, ঠান্ডা, ক্ষুধা, তৃষ্ণার শেষ বিন্দু পর্যন্ত টানার পর দেখবেন একটা অপার্থিব দৃশ্য চোখের সামনে, তখন কয়েকটা লম্বা দম নিলে আরো কয়েক কিলোমিটার উঠে পড়া যায়।

দেশের পাহাড়ে এর আগে কখনো চড়া হয়নি। বান্দরবানেও আগে কখনো যাইনি। মাস কয়েক আগে লোভ করে দুনিয়ার আরেক প্রান্তে একটা বড়ো পাহাড়ে চড়ার পরিকল্পনায় যুক্ত হয়েছি। এর প্রস্তুতি হিসেবে আমাদের দুই আয়োজক নিশাত মজুমদার (এভারেস্ট বিজয়ী প্রথম বাংলাদেশী নারী) আর অনু তারেক ভাই বান্দরবানে দুই দিনের পাহাড় চড়ার আয়োজন করলেন। পাহাড়ের ব্যাপারে আমি নিতান্তই নোভিস। উনাদের পরিকল্পনা আর পরামর্শই ভরসা। তারপরও অসংখ্য ভুল করেছি, ব্যাগ গুছানো, পানি নেওয়া, পাহাড় চড়ার সময় পানি, স্যালাইন, খাবার, এগুলোর রেশনিং—কত কিছু যে শেখার আছে!

নিশাত আপা যে পথ ডিজাইন করেছিলেন তা (অন্তত, আমার কাছে) অত্যন্ত দুরূহ ছিলো। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে, মাইলের পর মাইল, হাঁটা, চড়া, নামা, খাল-ছড়া পার হওয়া—কিছুক্ষণ পর পর মনে হয়েছে, কেন আসলাম এখানে, আমি কি একটু পর মারা যাচ্ছি! শারীরিক ক্ষমতার শেষ সীমা পর্যন্ত টেনে হিঁচড়ে নিতে নিতে যখন আর পারি না, তখন দলের কেউ না কেউ সাহায্য করেছে, উৎসাহ দিয়ে বাকিটা পথ পাড়ি দেওয়ার শক্তি জুগিয়েছে।

প্রথম দিনের প্রচণ্ড কষ্টকর ট্রেক শেষে আমরা একটা পাহাড় চূড়ার উপরে খুব ছোট্ট একটা আদিবাসী গ্রামে রাত কাটানোর জন্য থিতু হোলাম। গ্রামের একমাত্র পানির উৎস প্রায় একশ ফিট খাড়া পাহাড়ের নিচে একটা ঝরনা। উপরে সবাই প্রত্যেক বিন্দু পানি গুনে গুনে খরচ করে। পনির কষ্ট যে কী কষ্ট সেটা এই দুই দিনে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। এবং শহরে আমাদের পানি খরচের হুল্লোড়ের প্রতি আমার বিরক্তি ও ক্ষোভে শান দিয়েছি।

পরের দিন ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে আমরা আবার রওনা দিলাম, উদ্দেশ্য রোংরাং পাহাড় চূঁড়ায় প‍ৌঁছানো। রোংরাঙে পৌঁছে দেখি সূর্য কেবলে উঠছে, নেশা ধরানো ছবি চারপাশে। রোংরাং চূড়া সেরে নিচে নেমে আসাটা প্রথম দিনের চেয়েও কয়েক গুণ লম্বা ছিল, কোন বিরতি ছিলো না, পথে পানির কোন উৎস ছিলো না—তারপরও প্রথম দিনের চেয়ে কেন যেন কষ্ট কম লেগেছে বলে মনে হলো।

মানুষ এই যে পাহাড়ে উঠে, বিভিন্ন খবর-টবর হয়, ব্যাপারটা আমি তেমন পাত্তা-টাত্তা দিই না। এসব গল্প আমাকে কোনো উৎসাহ দেয় না। বরং ভাবায়, কী দরকার, কী হয় পাহাড়ে উঠে? আর কেউ যখন উঠলো তো সেই খবর দিয়ে আমি কী করবো? পৃথিবীর মানুষের কোন উপকারটা হচ্ছে পাহাড়ে চড়ে? পাহাড় চড়া আমার কাছে সবময়ই একটা স্বার্থপর কর্মকাণ্ড বলে মনে হয়েছে।

এবারের অভিজ্ঞতার পর মনে হলো, পাহাড় বাউয়ার সবচেয়ে বড় উপযোগিতা হচ্ছে মানুষের মধ্যে হিউমিলিটি আর টিমওয়ার্কের চর্চা বাড়ানো। হিউমিলিটি আসে নিজের শরীর ও মনের শক্তির সীমাবদ্ধতা চোখের সামনে দেখতে পেলে, প্রকৃতির বিশালতা ও মৃদু হাসির সাথে লুকিয়ে থাকা শান্ত ভয়াবহতা টের পেলে। পাহাড়ে চড়লে মানুষ বদলায়। চোখের সামনে নিজেকে তুচ্ছ, ক্ষুদ্র, ধুলিকণার মত অসহায় হতে দেখলে অহংকার কমে। তাই পাহাড় আপনাকে টানুক আর না টানুক, নিজেই নিজেকে টেনে পাহাড়ে উঠানো সবার জন্য জরুরি।

দুদিনের এই লাইফ চেঞ্জিং অভিজ্ঞতার জন্য, নিশাত মজুমদার, অনু তারেক, সকল সহযাত্রী ও আমাদের ম্যানেজারবৃন্দ জুম ওয়াইল্ড ট্রাভেলের হাসান মুরাদ, গিয়াস উদ্দিন, নুরুল ইসলাম রাজু সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments